ওয়াশিংটনে আনন্দ আয়োজনে দুর্গোৎসব নিয়ে আসছে “নীলাচল”-

442

এ্যন্থনী পিউস গমেজ, ভার্জিনিয়াঃ সময়ের চোরাবালিতে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে সময়। সময় নিরন্তর তার নিজস্ব গতিতে একইভাবে  বয়ে চলছে কিন্ত আমরা প্রবাসে যারা অনাকাংখিত ব্যস্ত জীবনধারায় মিশে গিয়ে প্রবাসী জীবনের গতির মাঝে যতি খুঁজে পাইনা, হাঁপিয়ে উঠি-  তাদের কাছে সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে বলে মনে হয়। কথাটি অবতারনা করার কারন, দেখতে দেখতে সময়ের পরিক্রমায় আবার এসে গেল হিন্দু ধর্মালম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসব। মনে হয় এইতো সেদিন “নীলাচল” এবং “গ্রেটার ওয়াশিংটন হিন্দু সোসাইটি”  আয়োজিত পূজা উৎসবে যোগ দিতে গেলাম আর ফিরে এলাম সর্বজনীন একটি পূজা উৎসবের আনন্দ অনুভূতিতে আবিষ্ট হয়ে।

14509166_189862248106518_1792233728_n

আগামী ১লা অক্টোবর, ২০১৬ ওয়াশিংটন ডিসি’র অন্যতম সংগঠন “নীলাচল’ আয়োজন করেছে তাদের দুর্গোৎসব উদযাপনের। মহা আরম্বর আর ধুমধামের সাথে আয়োজিত হচ্ছে এই পূজার অনুষ্ঠান। নীলাচলের পূজানুষ্টানের এটা দ্বিতীয় আয়োজন। নীলাচলের প্রথম আয়োজন ছিল গত বৎসর, মহা ধুমধামের সাথে আয়োজিত হয়েছিল সে দুর্গোৎসব- বিপুল লোক সমাগম এবং পূজামন্ডপে পূজার আয়োজন ছিল চমৎকার, সাথে ছিল সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দুর্গোৎসবের আনন্দে মেতে উঠার প্রত্যাশায়। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান…… সবার মিলনমেলা হয়ে উঠেছিল সে পূজানুষ্ঠান। এবারও রয়েছে তাদের সেই আয়োজন, কিন্তু এবারের আয়োজনে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। ইতিমধ্যের তাদের প্রস্তুতির পালা চলছে… এসে গেছে পূজা অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষন দেবী দুর্গার ৮ ফুট উঁচু বিশাল মূর্তি। এবারের পূজামন্ডপ সাজানোর পরিকল্পনায় রয়েছে অভিনবত্ব.. জাকজমকভাবে সাজবে এবারের পূজোর মঞ্চ যেভাবে সাজান হয় দেশের আঙ্গিনায়।দুর্গোৎসবের দিন সারাদিন ব্যপী চলবে পূজা-অর্চনা,‌ ধূপারতি, উলুধ্বনি, পুরোহিতের পূজাপাঠ, শ্রদ্ধানিবেদন, পুষ্পাঞ্জলী, ভক্তি উপহার, দেবীর চরণে প্রত্যাশার প্রার্থনা.! এছাড়া আনন্দ উল্লাসে ভরিয়ে তুলতে রয়েছে বিশিষ্ট শিল্পীদের নিয়ে একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।  আর এই আনন্দযজ্ঞে অংশগ্রহন করার জন্য “নীলাচল” আপনাদের সবাইকে জানাচ্ছে সাদর আমন্ত্রন… সবান্ধবে, সপরিবারে চলে আসুন “নীলাচল” এর এই অনুপম দুর্গোৎসবের আয়োজনে!!!

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বাঙালি হিন্দু সমাজের এটি অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় উৎসব এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ন সামাজিক উৎসবও বটে। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। এখন সর্বজনীন পূজায় “থিম” বা নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মণ্ডপ,প্রতিমা ও আলোকসজ্জার প্রবণতা দেখা যায়, বিশেষ করে ভারতে।দুর্গাপূজা ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালসহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রে পালিত হয়ে থাকে। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হওয়ার দরুন বাংলাদেশ এবং ভারতেদুর্গাপূজা বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় সময়ের পরিক্রমায় এই পূজা উৎসব এখন দেশের বৃত্ত পেড়িয়ে প্রবাসের মাটিতেও জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়ে থাকে। অভিবাসনের পথ ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রচুর হিন্দু ধর্মালম্বী লোক এখন প্রবাসে বসবাস করছেন এবং আমাদের ওয়াশিংটন মেট্রো এলাকায়ও যথেষ্ট সংখ্যক হিন্দু ধর্মালম্বী বাস করছেন।

প্রবাসে এসে বাঙালির জীবন যাপনের ধারা পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয়নি আমাদের মননশীলতার, মূল্যবোধের এবং ধর্মীয়, জাতীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যবাহী উৎসব উদযাপনের অনুভূতির।তাইতো পাশ্চাত্য দেশগুলিতে কর্মসূত্রে বসবাসরত বাঙালিরাও এসব উৎসব পালন করে থাকে মহা ধুমধামের সাথে। এর আরেকটি কারন হচ্ছে আমরা স্বদেশ থেকে দূরে এসে প্রানপ্রিয় মাতৃভূমির দূরত্বকে ভীষনভাবে অনুভব করি, মাটির গন্ধ আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে, তাইতো আমাদের মা, মাটি আর মানুষের টান আমাদের সব সময়ই ভালবাসার হাতছানিতে আকর্ষন করে। আর বিশেষ করে  আমাদের যে অনুভূতি এবং মূল্যবোধ ক্ষয়ে যায়নি এতটুকুও, তা হচ্ছে- আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ। আমরা যে ধর্মই পালন করিনা কেন, সবাই আমরা প্রবাসে যার যার ধর্মীয় উৎসবগুলোকে আরম্বরের সাথে পালন করে থাকি। এখন প্রবাসের মাটিতে লোক সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখানে যে কোন ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষ্যে প্রার্থনালয়ে গড়ে উঠে একেকটি ছোট্ট বাংলাদেশ, আমরা হারিয়ে যাই অতীতে সেই উৎসবময়তায়-  সে হোক ঈদ, হোক পূজা বা হোক বড়োদিন। তবে একটা বিষয়ে বেশ কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে, আর তা হল- এইসব ধর্মীয় উৎসবের সর্বজনীনতা।এটা দেশের মাটিতে গাঁথা ছিল বহুযুগ আগে থেকে, কিন্তু প্রবাসেও সেই মননশীলতা নিয়ে সবাই এই পূজা উৎসবে এসে যোগ দিয়ে থাকে এবং এই সর্বজনীন বিষয়টি আমাদের ক্ষুদ্রতা থেকে বেড়িয়ে এসে ভালবাসা ও সহভাগিতার বন্ধনে একটি বৃহত্তর সর্বজনীন সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করছে বলে অনুভূত হচ্ছে। গ্রেটার ওয়াশিংটনের সকল ধর্মের লোকের বসবাস… সত্যি এখানে গড়ে উঠেছে একটি ছোট্ট বাংলাদেশ। এখানে বাংলাদেশের বহু জেলার লোক যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি সব ধর্মের লোকও বিদ্যমান। আর ওয়াশিংটন প্রবাসী হিন্দু ধর্মালম্বীদের জন্য গড়ে উঠেছে দু’টি সংগঠন- “গ্রেটার ওয়াশিংটন হিন্দু সোসাইটি” এবং “নীলাচল”। এই দু’টি সংগঠন নিজেদের বৃত্তে স্ব স্ব অবস্থানে সারা বছর জুড়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যাচ্ছে এবং বিশেষ করে দু’টো সংগঠনই অনেক জাকজমকের সাথে সারাদিন ব্যাপী আয়োজন করে থাকে এই দুর্গোৎসব এবং ওয়াশিংটন প্রবাসী সকল বাঙালি এই উৎসবে যোগ দিয়ে এই উৎসবকে করে তোলে সার্থক ও সর্বজনীন- প্রানের ছোঁয়ায় উৎসব কেন্দ্রটি হয়ে উঠে একটি আনন্দআশ্রম। সবাই মিলন আর উৎসবের আনন্দে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়- মুছে যায় ধর্মীয় গোঁড়ামির বেড়াজাল, ফুটে ওঠে মানবিকতার সর্বজনীন মানসিকতা ও মূল্যবোধের বিজয়…!!!

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.