জর্জওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার,‘কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধিনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’

423
বিশেষ সংবাদদাতা:গণতন্ত্র ও মানবাধিকার হরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি  কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে আইনের শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সুশাসন পুরোপুরি বিপর্যস্থ। এরকম একটি সরকারকে ক্ষমতায় রেখে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।শনিবার বিশ্বখ্যাত জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির এলিয়ট স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল এফ্যায়ারস্ হলে  আমেরিকা বাংলাদেশ  কাউন্সিল ফর ডেমোক্রেসি (এবিসিডি) আয়োজিত বাংলাদেশে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বাধা, পারস্পরিক অনাস্থা ও অবিশ্বাস এবং জবাবদিহিতার অন্তরায় শীর্ষক সেমিনার সিরিজে বক্তারা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে  প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন  কংগ্রেসম্যান ডোনাল্ড এস বেয়ার।
সাংবাদিক ও  মানবাধিকার কর্মী রীতা রহমানের সন্চালনায়  সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন  ভার্জিনিয়া হাউস অব ডেলিগেট এর মেম্বার মার্ক ডি সিকলেস। সেমিনারে তিনটি উপস্থাপন করা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও মানবাধিকার কর্মী রীতা রহমান।  সেমিনারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ঝুঁকি ও  বিশ্বাসহীনতার উপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অস্টিন পি স্টেইট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. তাজ হাসমি,বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পারস্পরিক আস্থাহীনতার উপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সাইদ ইফতেখার আহমেদ। এছাড়ও প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. ফয়সাল আহমেদ, মর্গান স্টেইট ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অধ্যাপক ড. আশরাফ আহমেদ ,যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল একাডেমির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. কামরুল ইসলাম,  জাস্ট নিউজ বিডির সম্পাদক ও হোয়াইট হাউস করসপন্ডেন্ট মুশফিকুল ফজল আনসারী , মুসলিম কমিউনিটি টিভির সিইও সাংবাদিক কাজী শামসুল হক, যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল সরকারের প্রাক্তন প্রধান প্রকৌশলী সাহাদাত সোহরাওয়াদর্দী এশিয়ান সলিডারিটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ইমরান আনসারী প্রমূখ।উদ্ধোধনী সেশনে কংগ্রেসম্যান ডোনাল্ড এস বেয়ার বলেন, আমি যতোটুকু জেনেছি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন ও মানবাধিকার ঝুঁকির সম্মুখীন। বাংলাদেশের বিরাজমান এই সংকটগুলোর মধ্যে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।  তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমূদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে আর এই  প্রভাব স্পষ্টই অনুভূত হচ্ছে বাংলাদেশে। এতে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এবিষয়ে যুক্তরাস্ট্রকে সম্পৃক্ত করতে তিনি নিজে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির উত্তরণে  যে পক্রিয়া ওয়াশিংটনে শুরু হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রও রাজনৈতিক বিভক্তির মধ্য দিয়ে বর্তমানে পথ চলছে বলে উল্লেখ করেন প্রভাবশালী এই আইন প্রণেতা। তিনি ভার্জিনিয়া আঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীদের ভুয়সী প্রশংসা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও সমাজ উন্নয়নে বাংলাদেশীদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য মুক্ত গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে কংগ্রেসম্যান বেয়ার বলেন, অবাধ ও মুক্ত গণমাধ্যমই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার প্রধান নিয়ামক।মার্ক ডি সিকলেস বলেন , গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দুনিয়া জুড়েই আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকা স্বত্বেও সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে।
রীতা রহমান তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা দিনের পর দিন যেভাবে ক্ষমতাসীন দল কুক্ষিগত রেখেছে তা নজির বিহীন। মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি বিশেষ করে গুম খুন নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে । তিনি বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো প্রবন্ধে তুলে ধরেন। গত নভেম্বরে গুম হয়েছে অত্যন্ত ৫০০ জন মানুষ।

ড. তাজ হাসমি বলেন, বাংলাদেশের জাতি রাষ্ট্রকে  অত্যন্ত সুপরকল্পিতভাবে বিভক্ত করা হয়েছে । ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিরোধীদলকে পাকিস্তানি হিসেবে আখ্যায়িত করে । অথচ বিরোধীদল তথা বিএনপির হাজারো নেতা কর্মী সরাসরি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছে , নেতৃত্ব দিয়েছে। সরকারি দল চাইছে বিরোধী দলকে চিরতরে রাজনীতি থেকে উৎখাত করতে।

তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহনশীলতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন। নির্বাচনে পরাজিত হলে দলটি ফলাফল মেনে নিতে চায় না। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলেও মনে করেন।  নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় সরকার ‘স্বৈরতন্ত্রের ’ পথে হাটছে বলে মনে করেন তিনি।

ড. ইফতেখার আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল তাদের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারে নি। এর অন্তর্নিহিত কারণগুলি আমাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থাহীনতা এ জাতি রাষ্ট্রটিকে ঝুঁকির মূখে ফেলেছে।
এছাড়া বাংলাদেশের মানুষের পরিচয়  বাংলাদেশি না বাঙালী এ বিতর্ক জিইয়ে রেখে রাষ্ট্র ব্যবস্থার জাতীয় সংহতিকে চ্যালেঞ্জের মূখে ফেলেছে।

সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী বলেন, বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচন নামক প্রহসনকে কেবল প্রধান বিরোধীদল বিএনপিই বয়কট করেনি, বয়কট করেছে গোটা বিশ্ব। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার সকল রাষ্ট্রই নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল প্রেরণ স্খগিত করে বিগত একতরফা নির্বাচনে তাদের অনাস্থা জানান দিয়েছে। ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে গুম-খুনের যে সংস্কৃতি সরকার চালু করেছে তা নজিরবিহীন। বিরুদ্ধমত দমনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ইউনিট পর্যায়ের কর্মী পর্যন্ত হাজারো মিথ্যা মামলার স্তুপ। বেগম খালেদা জিয়াকে প্রতি কর্ম দিবসে আদালতে হাজির করে হেনস্তা করা হচ্ছে। আইন করে দেশের  জনপ্রিয় নেতা তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এমন ফ্যাসিবাদী সরকারকে ক্ষমতায় রেখে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কল্পনাই করা যায়না।
সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভয়েস অব আমেরিকা’র সরকার কবির উদ্দিন, ফকির সেলিম ও সাহাদাত হোসেন সবুজ, এবিসিড’র ড.  জিয়া হায়দার, ড. তামিনা চৌধুরী, ড. আলী আহমেদ, ড. শাহনাজ রহমান,  ম্যাথিউ, নিউইয়র্ক বাংলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শিবলী চৌধুরী কায়েস,  কমিনিটি ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম, এ জে হোসেন, শামসুদ্দিন মাহমুদ, তুহিন ইসলাম, জাহিদ খান প্রমুখ।

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.