বর্ণীল আয়োজনে ওয়াশিংটন ডিসিতে বাকা’র বর্ষবরণ

169

এ্যন্থনী পিউস গমেজ, ওয়াশিংটনডিসি:গত রবিবার, ১৫ই এপ্রিল মেরীল্যান্ডের সিলভার স্প্রীং-এ  রস্কো নিক্স এলিমেন্টারী স্কুল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল “বাঙালি-আমেরিকান খ্রীষ্টান এসোসিয়েশন অব মেরীল্যান্ড, ভার্জিনিয়া এন্ড ওয়াশিংটন ডিসি” বা ‘বাকা’র আয়োজনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, পহেলা বৈশাখ-১৪২৫। 30710366_2074548145918534_8953665657082216448_oগ্রামবাংলার  ঐতিহ্যবাহী উৎসব এখন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গ্রামীন জীবনের সীমানা পেড়িয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে শহরতলীতে। সময়ের বিবর্তনে সাংস্কৃতিক জীবনধারার পরিবর্তনের সাথে সাথে পহেলা বৈশাখের আড়ম্বরপূর্ণ আনন্দ আয়োজন বর্ষবরণের পথ ধরে  সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে শেকড়ের কাছে… গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের দোরগোড়ায়। আর এরই ধারাবাহিকতায় এখন শহরের মানুষগুলো এই ঐতিহ্যের মধ্যে খুঁজে পেতে চেষ্টা করছে গ্রামীন জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো, গ্রামের সহজ সরল মূল্যবোধের স্পর্শে সঞ্জিবীত হচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ এবং মিলনমেলার অনুভবে একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে গ্রামীন লোকজ শেকড়ের সাথে আত্মার সেতুবন্ধন। আর এই ঐতিহ্যের ঐশ্বর্য স্পর্শ করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অভিবাসী বাঙালি সমাজকে- তাইতো গ্রামীন সেই বৈশাখী উৎসব এখন মহাসমারোহে বর্ণীল আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে প্রবাসের আঙ্গিনায়ও। এ শুধু ভাল লাগা নয়, এ শুধু সাংস্কৃতিক নতুন জোয়ারে একাত্মতা নয়- এ যেন উৎসবের মধ্য দিয়ে আমাদেরও দেশের ঐতিহ্যের কোলে ফিরে যাবার প্রয়াস, আনন্দ আয়োজনের  মধ্য দিয়ে নস্টালজিক ভাবনায় আপ্লুত হবার বাসনা- আমরা ফিরে যাই আমাদের ফেলে আসা দিনগুলোতে, ফিরে যাই ‘মা-মাটি-মানুষে’র টানে, মাটির কাছে। আরও গভীরভাবে চেতনায় অনুভব করার প্রয়াস পেলে যে বিষয়গুলো আমাদের নাড়া দিয়ে যায়, তা হল আমাদেরই শুধু নয়, আমাদের নতুন প্রজন্মও আন্দোলিত হচ্ছে আমাদের এই ঐতিহ্যের আলোয়। 30729388_2074575515915797_6063641867944198144_oবাঙ্গালির প্রানের মেলা পহেলা বৈশাখ-  দেশের মত নাগরদোলা, পুতুল নাচ, ঘুড়ি উৎসব, মোড়গ যুদ্ধ ইত্যাদির আয়োজন এখানে না করতে পারলেও অন্তরের অনুভব এবং উপলব্ধির কোন ঘাটতি নেই।

প্রবাসের অন্যান্য অসংখ্য সংগঠনের মতই মেরীল্যান্ডের অন্যতম সংগঠন “বাকা”র আয়োজনে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বর্ষবরণ অনুষ্ঠান-১৪২৫।

প্রথমেই মঙ্গল শোভাযাত্রা করে সবাই মিলনায়তনে প্রবেশ করে। আয়োজনের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল বাংলার চিরায়ত গ্রামীন খাবারের আয়োজন, আর এবারের বিশেষত্ব ছিল ১৪২৫ ভাগ করে ১৪ রকমের পিঠা এবং ২৫ রকমের দেশী ভর্তার আয়োজন। ১৪ ধরনের খাঁটি বাঙালি  পিঠা পুলির আয়োজনে ছিল- পাটি সাপ্টা, ভাপা পিঠা, দুধ-চিতই, শুভ্র চিতই, লঙ্কা চিতই, ফুল পিঠা, নকসী পিঠা, বিবিকা পিঠা, বোড়া পিঠা, ফিলিস পিঠা, পুলি পিঠা, সিদ্ধ পুলি পিঠা, সুজি পিঠা এবং কলা পিঠা। এছাড়া ছিল মুখরোচক ঝালমুড়ি, চটপটি, নানা ধরনের মিষ্টি- রসগোল্লা, গোলাব জামুন, পায়েস, দই-খই ইত্যাদি। আর ছিল রসনা তৃপ্ত করার জন্য সুস্বাদু দেশী খাবারের বাহার, ২৫ রকমের ভর্তা-    আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, শুটকীর ভর্তা, চেপা ভর্তা, চিংড়ি ভর্তা, বরবটি ভর্তা, সীম ভর্তা, কালিজিরা ভর্তা, সরিষা ভর্তা, তিসি ভর্তা, মেথি ভর্তা, মিষ্টি কুমড়ার ভর্তা, কচু ভর্তা, কচু পাতা ভর্তা, মিষ্টি আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা, কাঁচা টমেটো ভর্তা, পাকা টমেটো ভর্তা, ঢেড়শ ভর্তা, করলা ভর্তা, কাঁচা কলা ভর্তা, রসুন ভর্তা, জলপাই ভর্তা, লাউ পাতা ভর্তা এবং টক পাতা ভর্তা। এছাড়াও ছিল শুটকি মাছ, ভুনা খিচুরী, বিরিয়ানী, তেহারী, ইলিশ ভাজা, পান্তা-ইলিশ, কচু শাক ইত্যাদি সুস্বাদু খাবার। খাবার ও খাবার পরিবেশনার পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ক্লারা মলি রোজারিও এবং লিলি রেগো।30728734_2074566119250070_1130659215937896448_o

আয়োজনের অংশ হিসেবে ছিল ছোট ছেলে-মেয়েদের “যেমন খুশী তেমন সাজ” অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের জীবন থেকে নেয়া বিভিন্ন চরিত্রের অনুকরণে ওরা সেজেছিল,  ভীষণ সুন্দর ছিল ছোট ছেলেমেয়েদের এই সাজ-পোষাক। যেসব ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন চরিত্রে সেজে পরিবেশনাটিকে প্রানবন্ত করে তুলেছিল, তারা হলঃ জেসন, টাইলার, জুলিয়া, অবনীল, অবন্তি, অরিয়ানা, এঞ্জেল, মৌমিতা, এ্যভলিন, হৃদীকা এবং আরও অনেকে। এপর্বের পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় ছিলেন কাকন রোজারিও এবং মৌসুমী রোজারিও।

অতঃপর শুরু হয় মূল সাংস্কৃতিক পর্ব। প্রথমেই মৌসুমী রোজারিওর পরিচালনায় সবার প্রানের গানটি গেয়েই শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান- “এসো হে বৈশাখ এসো এসো”। সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল নৃত্য, সঙ্গীত এবং আবৃত্তি। দেশের গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং লালনগীতির পরিবেশনায় সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছিল বর্ষবরণের আনন্দে আলোড়িত। অনুষ্ঠানে পরিবেশিত সাংস্কৃতিক পর্বে তবলা সঙ্গত করেনঃ রতন রোজারিও, সুকুমার পিউরিফিকেশন এবং হিউবার্ট গোমেজ।

যারা নৃত্য পরিবেশন করে সবাইকে মুগ্ধ করে দেয়, তারা হলঃ

একক নৃত্যে- হৃদী পেরেরা এবং সামান্থা ডি’রোজারিও।

দলীয় নৃত্যঃ “বাজে বংশী রাজহংসী” গানটির সাথে নৃত্য পরিবেশন করে সিন্থিয়া এবং তার দল। যারা অংশগ্রহন করে, তারা হলঃ লরেন, রিয়া, মুন, আর্চি, পিওনা, এঞ্জেল, মাত্রি, শ্রেয়া এবং হলি। কোরিওগ্রাফীতে ছিল সিন্থিয়া গোমেজ।

যারা একক সঙ্গীতের মূর্ছনায় সবার মন ভরিয়ে দেয়, তারা হলঃ সম্পদ কস্তা, টমাস গোমেজ, সরোজ ডি’কস্তা, ত্রপা পালমা, পলা রোজারিও এবং মুক্তা মেবেল রোজারিও।

দ্বৈত সঙ্গীত পরিবেশন করে সবার মন কেড়ে নেয়ঃ সম্পদ কস্তা এবং শার্লিন গোমেজ।

দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন সন্তোষ ও লিলি রেগো, জেসিকা, এঞ্জেলিকা, এলিসিয়া এবং সিন্থিয়া রেগো।

রবী ঠাকুরের কবিতা- “হঠাৎ দেখা” আবৃত্তি করেন এলভিস গোমেজ। এছাড়া স্বরচিত কবিতার বৃন্ত আবৃত্তি করে যারা সবাইকে মুগ্ধ করেন, তারা হলেনঃ রুবি রোজারিও, মালতি পালমা, পল পরি রোজারিও এবং সুবাস আব্রাহাম কস্তা।

বৈশাখী আয়োজনের বিশেষ আকর্ষনীয় পর্ব ছিল – যুগলদের ফ্যাসন শো- “বৈশাখী প্রেম”। এই পর্বটির পরিকল্পনা এবং পরিচালনায় ছিল পলা রোজারিও।

প্রথমেই বৈশাখী গানের সাথে দলীয় ফ্যাশন শো প্রদর্শন করেনঃ

পান্না গোমেজ, পান্না কার্মেল রোজারিও, হাসি ডি’ কস্তা, লক্ষী গোমেজ এবং লিলি রেগো।

পুরোনো দিনের জনপ্রিয় রোমান্টিক গানের সাথে  ( “পড়েনা চোখের পলক”, “ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায়”, “তুমি  চেয়েছিল ওগো জানতে” ইত্যাদি জনপ্রিয় গান) অত্যন্ত আনন্দপূর্ণ এবং চিত্তাকর্ষক ফ্যাশন শো’র পরিবেশনা সবাইকে রোমান্টিকতার আবহে মাতিয়ে দিয়ে অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে দেয়। যুগলদের আনন্দঘন এই ফ্যাশন শো’তে যারা অংশগ্রহন করেন, তারা হলেনঃ

রত্না ও পবিত্র ডি’ রোজারিও, বার্থলমিউ সমর ও রীনা কস্তা, খোকন স্ট্যানলী ও রোজমেরী গোমেজ, ডেনিস ও ঝুমকি রোজারিও, ডমিনিক ও লতা রেগো, ভিনসেন্ট ও ট্রিজা কস্তা এবং লাবন্য রড্রিক্স ও এ্যন্ডী।

অবশেষে ছিল তরুনদের নিয়ে সম্প্রতি গড়া তোলা নতুন ব্যান্ড, ‘বিদ্রোহ’-এর পরিবেশনা, যা সবাইকে আনন্দ দান করে। অংশগ্রহনে ছিলেনঃ

ড্রামে- ভিনসেন্ট ডি’ কস্তা, গীটারে- রিচার্ড পিয়াল রোজারিও এবং বেইস গীটারে ল্যারী।

সমগ্র অনুষ্ঠানটির প্রাঞ্জল উপস্থাপনায় ছিলেন কাকন ও মৌসুমী রোজারিও। শব্দ নিয়ন্ত্রনে ছিলেন জিম রোজারিও এবং সহযোগিতায় এলভিস গোমেজ।

সবশেষে বাকা’র সভাপতি খোকন স্ট্যানলী গোমজে সবাইকে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে একে সার্থক করে তোলান জন্য সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। এছাড়া সংগঠনের কার্যকরী পরিষদ, উপদেষ্টা, অনুষ্ঠান আয়োজন এবং উপস্থাপনায় সহযোগী সকল সেচ্ছাসেবকদের তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। ভবিষ্যতে এমনি চমৎকার আয়োজনে পাশে থাকার জন্য তিনি সবাকে বিনীত অনুরোধ ও আহবান জানান।

বৈশাখের বর্ণীল আয়োজনে, বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির স্পর্শে এবং স্বদেশী গ্রামবাংলার খাবারের বাহারে রসনা তৃপ্তির মধ্য দিয়ে একটি চমৎকার বর্ষবরণের আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। সবার সাথে প্রানের আনন্দে, মিলনের তৃপ্তিতে, প্রিয় মাতৃভূমি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভালবাসার আনন্দে নিজেদের আপ্লুত করে গন্তব্যের দিকে পা বাড়ায় সবাই। নান্দনিক বৈশাখী আয়োজনে একটি সুন্দর সন্ধ্যা-  কিন্তু অসংখ্য আনন্দঘন মুহূর্তের বৈশাখী স্মৃতির এ্যলবাম হয়ে রয়ে গেল সবার মনের গহীনে- “পহেলা বৈশাখ-১৪২৫”।

(ছবি: খোকন স্ট্যানলী গোমেজ)

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.